জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন কীভাবে শুরু হয় কৃষ্ণনগরে

21st November 2023 8:57 pm Country News
 জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন কীভাবে শুরু হয় কৃষ্ণনগরে


জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা বলতে গেলে প্রথমেই নদিয়ার জেলার কৃষ্ণনগর ও হুগলি জেলার চন্দননগরের কথা শোনা যায়। এই জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন হবার পিছনে কিছু ইতিহাস আছে।

 

জগদ্ধাত্রী পূজা বাঙালি হিন্দু সমাজের একটি বিশিষ্ট উৎসব হলেও, দুর্গা বা কালী পূজার তুলনায় এই পূজার প্রচলন অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে ঘটে। অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁর রাজধানী কৃষ্ণনগরে এই পূজার প্রচলন করার পর এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। যদিও দেবী জগদ্ধাত্রী যে বাঙালি সমাজে একান্ত অপরিচিত ছিলেন না, তার প্রমাণও পাওয়া যায়। শূলপাণি খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে কালবিবেক গ্রন্থে কার্তিক মাসে জগদ্ধাত্রী পূজার উল্লেখ করেন। পূর্ববঙ্গের বরিশালে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে নির্মিত জগদ্ধাত্রীর একটি প্রস্তরমূর্তি পাওয়া যায়। বর্তমানে এই মূর্তিটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালার প্রত্নবিভাগে রক্ষিত। কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালের আগে নির্মিত নদীয়ার শান্তিপুরের জলেশ্বর শিবমন্দির ও কোতোয়ালি থানার রাঘবেশ্বর শিবমন্দিরের ভাস্কর্যে জগদ্ধাত্রীর মূর্তি লক্ষিত হয়। তবে বাংলার জনসমাজে কৃষ্ণচন্দ্রে পূর্বে জগদ্ধাত্রী পূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি। কেবল কিছু ব্রাহ্মণগৃহে দুর্গাপূজার পাশাপাশি জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হত।

 

◾জগদ্ধাত্রী পূজো ঠিক কবে চালু হয়, তা নিয়ে নানা অনেক মত আছে । যদিও কৃষ্ণনগরেই এই পূজো প্রথমে চালু করেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় কিংবদন্তী অনুসারে নবাব আলিবর্দির খা, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় এর নিকট থেকে বারো লক্ষ টাকা নজরানা দাবি করেন। নজরানা দিতে অপারগ হলে তিনি রাজাকে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যান। তিনি মীরকাশিমের হাতে বন্দি হয়েছিলেন । দুর্গাপুজোর ঠিক আগে কিছু খাজনা মিটিয়ে মুক্তি পেয়ে নদী পথে নৌকায় কৃষ্ণনগরে প্রত্যাবর্তনের সময় ঘাটে বিজয়াদশমীর বিসর্জনের বাজনা শুনে তিনি বুঝতে পারেন সেই বছর ১৭৬১ দুর্গাপূজার কাল উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। জনশ্রুতি সেখানেই কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নে দেখেছিলেন যে এক রক্তবর্ণা চতুর্ভুজা কুমারী দেবী তাঁকে বলছেন আগামী কার্তিক মাসের শুক্লানবমী তিথিতে তাঁর পুজো করতে। সেই বছর আর দূর্গাপূজা করা সম্ভাব হয় নি। দুর্গাপূজার আয়োজন করতে না পেরে রাজা অত্যন্ত কাতার হয়ে পরলে দেবী দূর্গা সেই রাতেই স্বপ্নে দুর্গা জগদ্ধাত্রীর রূপে রাজাকে পরবর্তী শুক্লানবমী তিথিতে জগদ্ধাত্রী দুর্গার পূজা করার আদেশ দেন। দুর্গাপূজার ক্ষণ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে কৃষ্ণচন্দ্র সিদ্ধান্ত নেন রামচন্দ্রের অকালবোধনের মতো তিনিও অসময়ে দুর্গাপূজো করবেন জগদ্ধাত্রী পুজোর ভেতর দিয়ে। পণ্ডিতেরা বলেছিলেন, জগদ্ধাত্রী ও দুর্গা অভিন্ন। সেই থাকেই এই পুজোর সুত্রপাত কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা ১৭৬২ সালে। কেউ কেউ আবার কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র গিরিশচন্দ্রকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তক মনে করেন। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দরজা জগদ্ধাত্রী পূজার সময় আজও খোলা থাকে। পূজা পুরনো প্রথা মেনে হয় শুধুমাত্র নবমী তিথিতে।

 

১৭৭২ সালে রাজবাড়ির দেখাদেখি কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রজারা জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করেন। বুড়িমার পূজা নামে পরিচিত এই পূজা শুরু হয়েছিল ঘটে ও পটে। প্রথম দিকে স্থানীয় গোয়ালারা দুধ বিক্রি করে এই পূজার আয়োজন করতেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ গোবিন্দ ঘোষ ঘটপটের পরিবর্তে প্রতিমায় জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন। এখানকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল প্রায় সাড়ে সাতশো ভরি সোনায় গয়নায় দেবীপ্রতিমার অলংকারসজ্জা। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দাদের মতে এই দেবী অত্যন্ত জাগ্রতা, তাঁর নিকট সকল মনোষ্কামনাই পূর্ণ হয়।

 

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তনা কবে হয়েছিলো, এ বিষয়ে সঠিক তথ্য আজও বেশ ধোঁয়াশায়

 

◾চন্দননগরের দক্ষিনে গৌরহাটি গ্রামে সম্ভবত ১৭৬২ সনে কৃষ্ণচন্দ্রের এক দেওয়ান দাতারাম সুর ফেরিঘাট অঞ্চলে তাঁর বিধবা কন্যার বাড়িতে প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজন করেন কৃষ্ণচন্দ্রের অনুদানে । কৃষ্ণচন্দ্রের পদস্থ কর্মচারীরা রাজার উৎসাহে জগদ্ধাত্রী পূজো নানা জায়গায় চালু করেন । এগুলি ছিল পারিবারিক পূজো , পরে ব্যবসায়ী শ্রেণীর হাতে এই পূজো চলে যায় । আরো পরে ব্যবসায়ী শ্রেণীর পাশাপাশি এই পূজো বারোয়ারি পুজো হিসাবে প্রচলিত হতে থাকে । পুজোর কাজে সাধারণ মানুষও অংশ নিতে থাকে।

 

প্রায় আড়াইশো বছর আগে, কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পূজা দেখে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্রনারায়ণ চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টির নিচুপাটিতে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন। লক্ষ্মীগঞ্জ প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরেই এই পূজার সূচনা।

এই পূজা চন্দননগরে "আদি মা পূজা" নামে বিশেষ পরিচিত। এখনও পর্যন্ত পুরুষানুক্রমে দেওয়ান চৌধুরীদের উত্তরপুরুষের নামে পূজার সংকল্প হয়। এখানকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল সনাতনরীতির প্রতিমায় সাদা সিংহ এবং বিপরীতমুখী অবস্থানে হাতি। শোনা যায়, বিসর্জনের সময় আদি প্রতিমা জলে পড়লেই নাকি সাপের দেখা পাওয়া যায়। স্থানীয় বিশ্বাস এই দেবী অত্যন্ত জাগ্রত।

কিন্তু চন্দননগরে কে এই পূজো প্রচলন করেন এই প্রশ্নে অনেক মতভেদ আছে।অনেকেই বলেন , ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, অথচ ইন্দ্রনারায়ণ মারা গেছেন ১৭৫৬ সনে আর জগদ্ধাত্রী পূজো কৃষ্ণনগরে চালু হয় ১৭৬২ সনে। কাজেই কৃষ্ণনগর থেকে চন্দননগরে ইন্দ্রনারায়ন জগদ্ধাত্রী পুজোকে আনেননি। তাহলে কে ?

এ তো গেল ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ! অন্য আর এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে , জানা যায়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ ইন্দ্রনারায়ণ (ইতিপূর্বে বলা হয়েছে, যা সঠিক নয় সম্ভবত দাতারাম সুর) ছিলেন চন্দননগরের ফরাসি সরকারের দেওয়ান।

লক্ষ্মীগঞ্জ কাপড়েপট্টির জগদ্ধাত্রী পূজা চন্দননগরে দ্বিতীয় প্রাচীনতম পূজা।১৭৬৮ সালে চাউলপট্টির চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতান্তর হওয়ায় কাপড় ব্যবসায়ী শ্রীধর বন্দ্যোপাধ্যায় (মতান্তরে শশধর) রীতিমতো চাঁদা তুলে এই পূজা প্রবর্তন করেন।

বর্তমানে সারা রাজ্যেই, বাংলাদেশ কিছু জায়গায় বিক্ষিপ্ত ভাবে জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে থাকে যদি কৃষ্ণনগরের বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পূজা হয় দুশোরও বেশি যা জগদ্ধাত্রী পূজার জন্য বিখ্যাত চন্দননগরের চেয়েও অনেক বেশি।





Others News

হাইব্রিড সোলার সেলের যুগান্তকারী সাফল্য |

হাইব্রিড সোলার সেলের যুগান্তকারী সাফল্য |


বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যখন শক্তির তীব্র সংকট এবং জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া, তখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগৎ থেকে একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক খবর সামনে এসেছে। সৌর বিদ্যুতের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা এমন এক অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছেন, যা আগামী দিনে পৃথিবীর শক্তির চাহিদা মেটানোর চিত্রটাই বদলে দিতে পারে।

যুগান্তকারী আবিষ্কারটি কী?

দশকের পর দশক ধরে আমরা যে সাধারণ 'সিলিকন' সোলার প্যানেল ব্যবহার করে আসছি, তার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা (efficiency) সাধারণত ২০% থেকে ২৪%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি ট্যান্ডেম পেরভস্কাইট-সিলিকন (Tandem Perovskite-Silicon) নামক এক নতুন প্রযুক্তির সোলার সেল তৈরি করেছেন, যা সৌরশক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে ৩৪%-এরও বেশি কার্যকারিতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। এটি সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তির ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য লাফ।

কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই নতুন প্রযুক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী:

  • অল্প জায়গায় বেশি বিদ্যুৎ: এই প্যানেলগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি সৌরশক্তি শোষণ করতে পারে। ফলে, শহরাঞ্চলে যেখানে বাড়ির ছাদে জায়গা কম থাকে, সেখানে অল্প প্যানেল ব্যবহার করেই অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

  • পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধ: জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, খনিজ তেল) পোড়ানোর ফলে যে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবেশে মেশে, এই প্রযুক্তি তার একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। এটি বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) কমাতে সরাসরি সাহায্য করবে।

  • বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিপ্লব: যেহেতু এই সেলগুলো ছোট জায়গায় বেশি শক্তি তৈরি করতে পারে, তাই আগামী দিনে বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) ছাদে এই ধরনের প্যানেল লাগিয়ে চলাকালীন অবস্থাতেই গাড়ি চার্জ করার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যাবে।