ইরানকে ঘিরে ফের তীব্র উত্তেজনার আবহ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে। যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কড়া অবস্থান নিয়েছেন, তার পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে যে কোনও ধরনের হামলাই যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার জবাব হবে সর্বোচ্চ শক্তিতে।
ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেখান থেকে ফেরার পথে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরানের দিকে একটি বড় নৌবহর পাঠানো হচ্ছে এবং সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতিও চলছে। তাঁর কথায়, “আমাদের একটি শক্তিশালী নৌবহর ওই দিকে যাচ্ছে। আমরা দেখব কী করা যায়। সৈন্যদলও এগিয়ে চলেছে।” একই সঙ্গে আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের দেশকে ‘পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়া’র হুঁশিয়ারিও শোনা যায় তাঁর বক্তব্যে। এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান।
ইরান সরকারের এক শীর্ষ কর্তার বক্তব্যে স্পষ্ট, কোনও রকম নরম মনোভাব দেখাতে রাজি নয় তেহরান। তিনি বলেন, “আমাদের হাতে যা কিছু আছে, সবই ব্যবহার করতে আমরা প্রস্তুত। আমাদের উপর কোনও আক্রমণ—তা ছোট হোক বা বড়, সার্জিক্যাল বা কাইনেটিক—সবই আমরা যুদ্ধ হিসেবে দেখব এবং তার জবাব হবে সবচেয়ে কঠোর।” তাঁর কথায়, আমেরিকার দীর্ঘদিনের হুমকির কারণেই ইরান এখন সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি যে শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারও ইঙ্গিত মিলেছে বিভিন্ন রিপোর্টে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের দাবি অনুযায়ী, ইরানের দিকে পাঠানো হয়েছে ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’ বিমানবাহী রণতরী, সঙ্গে রয়েছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত তিনটি ডেস্ট্রয়ার। পাশাপাশি, ওই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে আমেরিকার বিমান বাহিনীর এক ডজন F-15 যুদ্ধবিমান। এর পাল্টা প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানও, যদিও সেই পরিকল্পনার খুঁটিনাটি প্রকাশ্যে আনেনি তারা।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার প্রেক্ষাপটও। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে সে দেশে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ। প্রথমে আর্থিক সংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলেও পরে তা ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের ক্ষমতাচ্যুতির দাবিতে পথে নামেন লাখো মানুষ। এই বিক্ষোভে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান ট্রাম্প।
তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় ইরান সরকার। বিক্ষোভ দমনে নির্বিচারে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও আলোড়ন তোলে। এর পরই ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দেন ট্রাম্প। যদিও এক পর্যায়ে কিছুটা সুর নরম করে তিনি জানান, বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না বলে তাঁকে আশ্বস্ত করেছে ইরান সরকার। তখন কূটনৈতিক মহল মনে করেছিল, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা হয়তো কিছুটা কমছে।
কিন্তু ডাভোস সফর শেষে ট্রাম্পের নতুন মন্তব্যে সেই আশা ভেস্তে যায়। নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে বলেই মত বিশ্লেষকদের। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তার প্রভাব শুধু আমেরিকা-ইরান সম্পর্কেই নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার উপর পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।